সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু

আজকের দেশবার্তা ডট কম:-

রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি প্রায় প্রতিটি জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু। জেলার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা বেড়েই চলছে। শিশু কিশোরদের পাশাপাশি বয়স্করাও এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। নিহতের সংখ্যাও বেড়ে চলছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষ। উপরন্তু হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না থাকায় চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন রোগীর স্বজনরা। বিস্তারিত আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্টে-

বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান: বাগেরহাটে ৮ জনের শরীরে ডেঙ্গু রোগের উপস্থিতি শনাক্ত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। গতকাল সকাল পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বাগেরহাট সদর হাসপাতালে ৮ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন।

এর মধ্যে ১ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকি ৭ জনের মধ্যে ৪ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয় এবং অন্য ৩ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। বাগেরহাট ডেঙ্গুতে আক্রান্তরা সবাই ঢাকা ফেরত বলে স্বাস্থ্য বিভাগ দাবি করেছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এই ৮ জনেরই বাড়ি বাগেরহাট সদর উপজেলা বিভিন্ন এলাকায়। বাগেরহাট জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ বলেন, বুধবার সকাল পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বাগেরহাট সদর হাসপাতালে ৮ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ায় তা প্রতিরোধে বাগেরহাটের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত সভা-সমাবেশ করা হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগ নির্ণয় করতে সদর হাসপাতালে একটি রোগ নির্ণয় সেল চালু করা হয়েছে। এই রোগের উপশমে পরীক্ষার জন্য আসতে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এলাকা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে বিভিন্ন প্রশাসনসহ সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন কাজ করছে। কারো শরীরে ডেঙ্গু রোগের উপসর্গ দেখা দিলে টিকিৎসকের পরামর্শ নিতে সবার প্রতি আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান: সিরাজগঞ্জে গত এক সপ্তাহে ১৯ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করেছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। এদিকে, ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক র‌্যালি করেছে। এছাড়াও সদর উপজেলার পক্ষ থেকে মশক নিধন অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

সিরাজগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. জাহিদুল ইসলাম জানান, ২৩শে জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ১৯ জন ডেঙ্গু রোগী সিরাজগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে ইতিমধ্যে ১০ জন সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে গেছেন এবং দু’জনকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে ৯ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা জেবুন্নাহার বেগম বুধবার জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় মোট ছয়জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এরা হলেন সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের সুকুমার (২০), কুড়ালিয়া গ্রামের মিলন (১৮), নূর ইসলাম (১৫), পৌর এলাকার মিরপুর মহল্লার জাকিয়া (১৭), কামারখন্দ উপজেলার নাজমুল (১৬) ও উল্লাপাড়া পৌর এলাকার সোহাগী (১৭)।

সিরাজগঞ্জ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রমেশ চন্দ্র সাহা জানান, প্রচণ্ড জ্বর ও ব্যথা নিয়ে এসব রোগী হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে ভর্তি হন। পরে রোগীদের রক্ত ও বিভিন্ন পরীক্ষার পর ডেঙ্গু শনাক্ত করা হয়। আক্রান্তদের বেশির ভাগই রাজধানী ঢাকা থেকে ডেঙ্গুর জীবাণু বহন করে নিয়ে এসেছেন। সিরাজগঞ্জে এ রোগের প্রাদুর্ভাব নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।

মেহেরপুর প্রতিনিধি জানান: মেহেরপুরের গাংনীতে তিন জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার এক জন এবং বুধবার আরো দু’জনের শরীরে ডেঙ্গু চিহ্নিত হয়েছে। তাদেরকে গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

এরা হলেন গাংনী পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় পাড়ার হোসেন আলীর স্ত্রী উম্বিয়া খাতুন (৩৫), চৌগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক নাছিমা খাতুন (৫৫) ও কষবা গ্রামের বাসিন্দা ধানখোলা ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য সুফিয়া খাতুন (৪৮)। তাদের হাসপাতালের একটি কেবিনে আলাদা করে মশারীর মধ্যে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত সুফিয়া খাতুন জানান, তিনি গেল ২৬শে জুলাই ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে এক রোগীর কাছে রাত কাটিয়েছিলেন। বাড়ি ফেরার পর তার জ্বর শুরু হয়। গতকাল সকালে গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তির পর তার ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষা রিপোর্টে ডেঙ্গু পজিটিভ।

এদিকে প্রথম দিন ভর্তি হওয়া উম্বিয়া খাতুন ও আজ ভর্তি হওয়া নাছিমা খাতুন গাংনীতেই থাকেন। তাই গাংনীতে এডিস মশা রয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গাংনী হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. সজীব উদ্দীন স্বাধীন বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই আবার এটি এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। পৌরসভা, উপজেলা প্রশাসন, রাজনীতিক, সাংবাদিকসহ ও জনগণ সকলে মিলে যদি এ ব্যাপারে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যায় তবে ডেঙ্গু নির্মূল করা সম্ভব। এদিকে ডেঙ্গু পরীক্ষা করার স্ট্রিপ নেই।

আড়াইহাজার (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান: নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে এক ছাত্রীসহ তিন জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এরা হলেন স্থানীয় গোপালদী পৌরসভার দাইরাদী এলাকার ওসমান মোল্লার মেয়ে সুমাইয়া আক্তার (১৮)। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। দ্বিতীয় জন পাঁচগাঁও চরপাড়া এলাকার সিরাজুল ভূঁইয়ার ছেলে মাছুম (২৪)। তিনি পেশায় বাসচালক। তৃতীয় জন শালমদী এলাকার আতাউর রহমানের ছেলে সজীব (১৮)। তিনি পেশায় মোটর মেকানিক। সজীবের বাবা আতাউর রহমান জানান, সে ঢাকার মতিঝিল এলাকায় মোটর মেকানিকের কাজ করেন। মঙ্গলবার রাতে শরীরে জ্বর নিয়ে বাড়িতে ফিরে। পরে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সুমাইয়া জানান, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াছেন। শরীরে জ্বর নিয়ে তার বাড়ি দাইরাদীতে ফেরেন। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে টিএইচও ডা. হাবিব ইসমাইল ভূঁইয়া বলেন, ‘আমরা এ পর্যন্ত ৬ জনকে শনাক্ত করতে পেরেছি। এর মধ্যে তিনজনকে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, শরীরে জ্বর অনুভব করলে প্রচুর পরিমাণ পানি পান করতে এবং তরল খাবার খেতে হবে। প্যারাসিটামল গ্রুপ ব্যতীত অন্য কোনো ওষুধ সেবন করা যাবে না।

কেন্দুয়া (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি জানান: ঢাকায় আন্দোলনরত নেত্রকোনার কেন্দুয়া পৌরসভার দুই কর্মচারী ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গতকাল এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কেন্দুয়া পৌরসভার হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা সেলিম উদ্দিন। আক্রান্তরা হলেন পৌরসভার লাইন্সে ইনিসপেক্টর আল-আমীন ও কার্যসহকারী মোস্তাক হোসাইন জামিন (হিল্লো)। সূত্র জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে পেনশনসহ বেতন-ভাতা পাওয়ার দাবিতে সারা দেশের ন্যায় পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাজধানী ঢাকায় লাগাতার আন্দোলনে অংশ নিয়ে এই জ্বরে আক্রান্ত হন। পৌরসভার কার্যসহকারী মোস্তাক হোসাইন জামিন (হিল্লো) প্রথমে আক্রান্ত হলে তাকে ঢাকার বাসাবো জেনারেল হসপিটালে ভর্তি করা হয় এবং পৌরসভার লাইন্সে ইনিসপেক্টর আল-আমীন গত রোববারে আক্রান্ত হলে তিনি কিশোরগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। কেন্দুয়া পৌরসভার হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা সেলিম উদ্দিন জানায় জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা ভর্তি করা হয়।

নড়াইল প্রতিনিধি জানান: নড়াইলে ডেঙ্গু জ্বর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। জেলার ৩ উপজেলার মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। গতকাল পর্যন্ত নড়াইল সদর হাসপাতালে তিন শিশুসহ ৮ ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে দু’শিশুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তরা হলেন- সদর উপজেলার মুলিয়া ইউনিয়নের ননীক্ষীর গ্রামের গৌরাঙ্গ বিশ্বাসের মেয়ে বিপাশা বিশ্বাস (৮), লোহাগড়া উপজেলার দিঘলিয়া ইউনিয়নের তালবাড়িয়া গ্রামের রাকিবুলের ছেলে মেহেদি হাসান (৮), নড়াইল পৌরসভার মহিষখোলা এলাকার জাহাঙ্গীর হোসেনের ছেলে সাদ (১৩), কালিয়া উপজেলার চাচুড়ী ইউনিয়নের বনগ্রামের হাফিজুরের ছেলে শাকিল (২০), একই গ্রামের রেজাউলের ছেলে শাপলু মোল্যা (৩০), পাশের কালডাঙ্গা গ্রামের তৈয়েবুর রহমানের ছেলে রিয়াজ ফকির (৩০), মাগুরা জেলার মধুখালী গ্রামের কাইজার সিকদার (১৯) এবং ঢাকা থেকে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগে কর্মরত কর্মচারী কালিয়া উপজেলার চাঁচুড়ী গ্রামের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ (৫৫) সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে শিশু বিপাশা বিশ্বাস ও মেহেদি হাসানের শারীরিক অবস্থা অবনতি হওয়ায় তাদের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।
স্টাফ রিপোর্টার, যশোর থেকে জানান: যশোরে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। ঢাকা থেকে আগত রোগীর সঙ্গে বাড়ছে স্থানীয়ভাবে আক্রান্তের সংখ্যা। গতকাল দুপুর পর্যন্ত যশোর জেনারেল হাসপাতালে ১৬ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। যার মধ্যে স্থানীয়ভাবে আক্রান্তের সংখ্যা ৬ জন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ দিনে যশোর জেনারেল হাসপাতালে মোট ৬৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। যার মধ্যে ১১জন চিকিৎসাসেবা নিয়ে চলে গেছেন। বর্তমানে হাসপাতালে ৫৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। গত দুদিনে কেবল ভর্তি হয়েছে ২৯ জন রোগী। ভর্তিকৃতদের মধ্যে পুরুষ রোগীর সংখ্যা ৩৮ জন ও নারী ১৭ জন।

যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. এটিএম সোলায়মান কবীর জানান, চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে দু’জনের মধ্যে আশঙ্কাজনক। একজনের রক্তে প্লাটিলেটের সংখ্যা ১৫ হাজারের নিচে নেমে এসেছে। তাকে ঢাকায় রেফার করা হলেও অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে যেতে পারেননি। তাকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসাসেবা দেয়া হচ্ছে। তবে অন্যরা স্থিতাবস্থায় আছে। যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, যশোরে রোগীর সংখ্যা গাণিতিক হারে বাড়ছে। তাদের ন্যাশনাল গাউড লাইন মেনে সঠিক চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তবে রোগীর চাপ ও প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ঢাকায় অবস্থানরতদের ঈদের ছুটি কর্মস্থলে কাটানোর অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
চরফ্যাশন (ভোলা) প্রতিনিধি জানান : ভোলার চরফ্যাশন পৌরশহরসহ উপজেলা জুড়ে মশার উপদ্রব বেড়েছে। এতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। মশা নিধনে পৌরসভা কিংবা উপজেলা প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। গতকাল পর্যন্ত চরফ্যাশনে ৭ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করা হয়েছে।

চরফ্যাশন হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষায় নেই কোনো ডিভাইস। ফলে বাধ্য হয়ে ডেঙ্গুজ্বর পরীক্ষায় যেতে হচ্ছে ঢাকা কিংবা বরিশালে। জানা যায়, চরফ্যাশন পৌরসভার ড্রেন পরিষ্কার না করা, শহরের চার পাশের খালগুলো ময়লা-আবর্জনায় একাকার। এর ফলে সৃষ্ট পানিবদ্ধতায় বৃদ্ধি পাচ্ছে মশা। ময়লা-আবর্জনার স্তূপেও বৃদ্ধি পাচ্ছে মশার প্রজনন। শিশু, বৃদ্ধসহ সব বয়সী মানুষ মশার কামড়ে অতিষ্ঠ। স্কুল, কলেজ, অফিস আদালত সর্বত্র মশার উপদ্রব। মশারি টাঙিয়েও এর থেকে নিস্তার নেই, একটু ফাঁক ফোকর পেলেই মশারির  ভেতরে ঢুকে যায় মশা। মশার কামড়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থী ও শিশুরা। মশা নিধনে পৌরসভায় ফগারগান থাকলেও গত একযুগ ধরে তার ব্যবহার নেই। চরফ্যাশন পৌরসভার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ইকবাল হোসেন ও কনজারভেটিভ ইন্সপেক্টর সোহবার হোসেন এ প্রসংঙ্গে কোনো সদোত্তর দিতে পারেননি। পৌরসভার মেয়র শ্রী বাদল কৃষ্ণ দেবনাথ সাংবদিকদের জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মশা নিধনে কোনো বাজেট নেই পৌরসভায়। ফলে এ ব্যাপারে কিছু করতে পারছেন না। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার সিরাজ উদ্দিন বলেন, বুধবার সন্দেহজনকভাবে একজন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে আরো দুইজন ভর্তি হয়েছে, তাদের ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে। এ সমস্ত রোগী ঢাকা থেকে আগত। চরফ্যাশন হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষায় ডিভাইস নেই। শিগগিরই ডিভাইস পাওয়া যাবে। এদিকে অপর একটি সূত্র জানায়, ডাক্তার সুব্রত কুমারের চিকিৎসাধীন তিন শিশু ও ডাক্তার ছিদ্দিকুর রহমানের চিকিৎসাধীন একজনের ডেঙ্গুর সন্দেহ হওয়ায় তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল বা ঢাকায় যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর থেকে জানান : রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী সংখ্যা ৫৮-তে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী বাড়তে থাকায় হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। এছাড়া হাসপাতালের শয্যার তুলনায় রোগী চিকিৎসাধীন থাকায় রোগীরা পেড়েছেন বিপাকে। হাসপাতালের মেঝে, বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা।

গতকাল রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সুলতান আহমেদ বলেন, প্রতিদিনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। আমরা আমাদের সাধ্যমতো সেবা দিয়ে যাচ্ছি। চিকিৎসা পাওয়ার পর সব রোগীই শঙ্কামুক্ত রয়েছে। আশা করি দ্রুই চিকিৎসা নিয়ে তারা বাড়ি ফিরবেন। বর্ষাকাল হওয়ায় ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। আমরা মানসিকভাবে প্রস্তুত রয়েছি রোগীদের সেবা দিতে।

নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান: ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ এবার নেত্রকোনায় ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে জনমনে এক ধরনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. নিজামুল হাসান জানান, গত মঙ্গলবার আধুনিক সদর হাসপাতালে এক জন এবং বুধবার দুপুর ২টা পর্যন্ত চার জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসে। তারা হলেন, নেত্রকোনা পৌরসভার সাতপাই এলাকার কামাল মিয়ার ছেলে মামুন (১৩), কুরপাড় এলাকার সুরুজ আলীর ছেলে মফিজুল ইসলাম (৩৭), নেত্রকোনা সদর উপজেলার সুকন্দিয়া গ্রামের মতি মিয়ার ছেলে শাহ্‌জাহান (২৬), কলমাকান্দা উপজেলার চাঁন মিয়ার ছেলে ওয়াজিব (১৮) এবং মোহনগঞ্জ উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের আব্দুল হেকিমের কন্যা রিমু আক্তার (১৭)। তিনি আরো জানান, নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ডেঙ্গু রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা প্রত্যেকেই দু’একদিনের মধ্যে ঢাকা থেকে নেত্রকোনায় এসেছেন।

ভৈরব প্রতিনিধি জানান : ভৈরবে এনএস ওয়ান স্ট্রিপ না থাকায় ডেঙ্গু জ্বর শনাক্ত ব্যাহত হচ্ছে। উপজেলা লেভেলে সরকারিভাবে ডেঙ্গু শনাক্তকরণের এনএস ওয়ান স্ট্রিপ হাসপাতালে এখনো এসে পৌঁছায়নি। ফলে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এটি হাসপাতালে পৌঁছলে তখন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করতে আর কোনো সমস্যা হবে না। বর্তমানে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই ডেঙ্গু জ্বর শনাক্ত করা হচ্ছে। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ডেঙ্গু রোগী শনাক্তে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকই মানুষের এখন এক মাত্র ভরসা। এন এস ওয়ান স্ট্রিপ না থাকায় রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই ডেঙ্গু আক্রান্ত শনাক্ত হচ্ছে লোকজন।

এখন পর্যন্ত ভৈরবে প্রায় ত্রিশজনের মতো ডেঙ্গু রোগী শনাক্তর পর তারা চিকিৎসা বাড়িতে চেলে গেছেন। এ ছাড়াও ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নজরুল ইসলাম ও সাবিদা নামে দুই জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত সাবিদা জানান, তিনি কিছুদিন পূর্বে ঢাকায় তার ছেলের বাসায় গিয়েছিলেন বেড়াতে। সেখান থেকে তিনি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন। তার বাড়ি রায়পুরা থানাধীন রামনগর গ্রামে। গত সোমবার দিন এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এখানে ভর্তি রয়েছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডাক্তার বুলবুল আহম্মেদ জানান, ভৈরব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মিলে গড়ে প্রতিদিন আট থেকে দশ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হচ্ছে। অধিকাংশ রোগীই ঢাকা থেকে আক্রান্ত হয়ে  ভৈরবে আসছে। ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নজরুল ইসলাম ও সাবিদা নামে দু’জন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগী ভর্তি রয়েছে। আরো অনেকেই চিকিৎসা নিয়ে বাড়িতে চলে গেছেন বলে জানান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রতিদিনই হাসপাতালসহ প্রতিটি গ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্টিানে লিফলেট বিতরণ ও মসজিদে মাইকিংয়ের মাধ্যমে জনসচেতনতা মূলক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। এখন পর্যন্ত ভৈরবে প্রায় ত্রিশ জনের মত ডেঙ্গু রোগী শনাক্তর পর তারা চিকিৎসা নিয়েছেন।

মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি জানান  : সারা দেশের ন্যায় টাঙ্গাইলের মির্জাপুরেও ব্যাপকভাবে ডেঙ্গু আক্রান্তের প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। গতকাল বিকাল ৪টায় রিপোর্টটি লেখা পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে ৩ শিশুসহ ভর্তি হয়েছেন ১৭ জন। এছাড়াও বিগত তিনদিনে মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় অর্ধশতাধিক বলে জানা গেছে। তবে তাদের মধ্যে অর্ধেক রোগীই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

সরজমিন মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতাল পরিদর্শন করে দেখা যায় শিশু থেকে বৃদ্ধ ২৪জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এছাড়া একজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে রেফার্ড করা হয়েছে বলেও জানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ড. এবিএম আলী হাসানকে প্রধান করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষ মনিটরিং কমিটি গঠন ও পরবর্তীতে শুধুমাত্র ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা আলাদাভাবে চিকিৎসা দেয়ার কথা ভাবছে বলে জানান কুমুদিনী হাসপাতালের জেনারেল ম্যানেজার অনিমেষ ভৌমিক। মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু আক্রান্ত উপজেলার বহুরিয়া গ্রামের রুবেল মিয়া জানান, তিনি ঢাকার আগারগাঁওতে পড়াশোনা করেন। গত ২৬শে জুলাই জ্বরাক্রান্ত হলে পরীক্ষা করে তার ডেঙ্গু ধরা পড়ে। ঢাকায় আত্মীয়স্বজন কেউ না থাকায় গত ২৯শে জুলাই তিনি নিজ এলাকার হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানান। ডেঙ্গু আক্রান্ত রানা নামের এক রোগী ধীর গতিতে তার চিকিৎসা হওয়া নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডেঙ্গু আক্রান্ত এক শিশুর বাবা বলেন, যদিও স্বল্প সময়ের চিকিৎসায় তার বাচ্চাটি সুস্থ হয়ে গিয়েছে তবুও ডেঙ্গু বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আরো আন্তরিক হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন।

হোমনা প্রতিনিধি জানান : কুমিল্লার হোমনায় গত চার দিনে পাঁচজন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে ডেঙ্গু শনাক্তকরণ পরীক্ষার-নিরীক্ষার জন্য বেশি টাকা নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দু’জনকে ঢাকায় রেফার করা হয়েছে, একজন কিছু না বলেই চলে গেছেন, একজনকে বাড়িতে পাঠানো হয়েছে এবং একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি অন্যান্য সাধারণ রোগীদের মাঝেও কিছুটা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। আক্রান্ত রোগীরা হলেন- হরিপুর গ্রামের মোহন মালা (৩০), ঘনিয়ারচরের সোহাগ (১৯), কারারকান্দির তাসলিমাকে (৩০) উন্নত চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ঢাকায় রেফার করা হয়েছে এবং উপজেলা সদর চৌরাস্তা এলাকার আমেনা খাতুন (২২) উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রয়েছেন। ঢাকাসহ সারা দেশে ডেঙ্গু প্রকট আকার ধারণ করায় ইতিমধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষও তার আশেপাশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান অব্যাহত রেখে অন্য রোগীদের সচেতনতা সৃষ্টি করে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। রোগীদের প্রতিও রাখছেন সতর্ক দৃষ্টি। ঢাকা লালমাটিয়া কলেজের অর্থনীতি বিষয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ঢাকায় থাকাকালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বাড়ি এসে চতুর্থ দিনে গতকাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন। তাকে সার্বক্ষণিক মশারির ভেতরে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন ডাক্তার-নার্স। উপজেলার বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে ডেঙ্গু শনাক্তকরণ পরীক্ষার-নিরীক্ষার জন্য বেশি টাকা নেয়ার অভিযোগ উঠেছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সরফরাজ হোসেন খান জানান, উপজেলায় এ পর্যন্ত পাঁচজন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। তবে একজন উপজেলার কারারকান্দি গ্রামের তাসলিমা খাতুন বাড়িতে থেকেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। সে বর্তমানে মোটামুটি ভালো আছে। তবুও যোগাযোগ রাখছি। আর ঢাকা থেকে আক্রান্ত হয়ে আসা দু’জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় রেফার করে দিয়েছি। একজন ছাত্রী সে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি আছেন।

 

Leave a Comment